শেখ রাসেল: স্বাধীনতার জন্য সাত বছর হতে না হতেই বন্দিজীবন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়তম স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব ১৯৬৬ সালে মাঝামাঝি ক্ষোভের সঙ্গেই বলেছিলেন, ‘বাপের পেছনে গোয়েন্দা লেগেছিল ২৮ বছর বয়সে, কিন্তু ছেলের পেছনে লাগল দেড় বছর বয়সেই।’

এর প্রেক্ষাপট ছিল এভাবে- ১৯৬৬ সালের ৮ মে গভীর রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয় পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে। অভিযোগ গুরুতর- স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা প্রদান করে তিনি কার্যত পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। এর আগেও তিনি অনেকবার গ্রেফতার হয়েছেন। তবে ছয় দফা প্রদানের পর পাকিস্তানের শাসকরা তাকে আরও দমিয়ে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রথমে তাকে বিনাবিচারে বন্দি রাখা হয়। পরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় প্রধান আসামী করা হয়। কোনো রাজবন্দির সঙ্গে দেখা করতে হলে জেল কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। এ জন্য আবেদন করার পর গোয়েন্দারা সাক্ষাৎপ্রার্থী সম্পর্কে অনুসন্ধান করে। দেড় বছরের শিশু সম্পর্কে গোয়েন্দারা অসৌজন্যমূলক নানা প্রশ্ন করায় তার মা ক্ষুব্ধ মন্তব্য করেছিলেন- দেড় বছরেই গোয়েন্দা লাগল রাাসলের পেছনে।

কিন্তু তখনও তিনি ভাবতে পারেননি যে এ ঘটনার পাঁচ বছর যেতে না যেতেই এই রাসেলকেই বন্দিজীবন কাটাতে হবে। পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তখন বন্দি। তবে আগের বিভিন্ন সময়ের মতো নয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তাকে বন্দি করা হয় বাংলাদেশ-এর স্বাধীনতা ঘোষণার কারণে। এর কয়েকদিন পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘অন্য রাষ্ট্র পাকিস্তানে।’ আর শেখ রাসেলকে মা, দুই বোন, বড় ভগ্নিপতি ও মেঝ ভাই শেখ জামালসহ বন্দি করে রাখা হয় ধানমন্ডি ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে। বড় ভাই শেখ কামাল ২৫ মার্চের পরপরই যোগ দেন মুজিবনগর সরকার গঠিত মুক্তিবাহিনীতে। কিছু দিন যেতে না যেতেই এই বাড়ি থেকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ভয়ঙ্কর মিলিটারিদের নজর এড়িয়ে শেখ জামালও চলে যান রণাঙ্গনে, মুক্তিবাহিনীর গর্বিত সদস্য হতে। এ বাড়িতে বন্দি থাকার সময়েই বড় বোন শেখ হাসিনার প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম হয়।

কেমন ছিল এ বন্দিজীবন? এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ লেখায় বলেছেন, ‘ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবনযাপন শুরু করে। ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই। কোনো খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো। বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোন খবর আমরা জানি না। কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথমদিকে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর।’ [ইতিহাসের মহানায়ক, পৃষ্ঠা ২১]

শেখ হাসিনা লিখেছেন, ছাব্বিশ মার্চ প্রথম প্রহরের পরপরই আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরদিন আবার আমাদের বাসা আক্রমণ করে। রাসেলকে নিয়ে মা ও জামাল পাশের বাসায় আশ্রয় নেয়।... আমার মা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হন। [পৃষ্ঠা ২১]

শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অনেকবার কারাগার ‘দেখেছেন’। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি স্বামীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত কারাগার ‘দেখায়’ সঙ্গে থাকত শেখ হাসিনা ও শেখ কামাল। ১৯৫৮ সালে এ তালিকায় যুক্ত হয় শেখ জামাল ও শেখ রেহানার নাম। শেখ রাসেলের প্রথম কারাগার ‘দেখা’ ১৯৬৬ সালের ৮ মে মাসে পিতার গ্রেফতারের পর।

শেখ রাসেলের জন্মের তারিখ ১৮ অক্টোবর, ১৯৬৪ সাল। বঙ্গবন্ধু তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে দুই দফায় পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫৪ সালে তিনি পুর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য হিসেবে, যার দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানের জন্য সংবিধান প্রণয়ন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয় এবং পূর্ব পাকিস্তান আইনসভা ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইনসভা মিলিটারি ফরমানে বাতিল হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের স্থান হয় আরও অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কারাগারে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ‘রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে জেল খেটেছেন। ১৯৪৯ সালে দুই দফা জেল- প্রথম বার দুই মাসের বেশি, দ্বিতীয় বার প্রায় আড়াই বছর। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়ার পর ফের জেলজীবনে। ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর থেকে ফের বন্দি। কিন্তু তিনি যে অদম্য। কারাগার থেকে মুক্তি মিলতে পারে যদি দাসখত বা বন্ড লিখে দেন- ‘রাজনীতি করব না’। পাকিস্তানের বাঙালি বিদ্বেষী মুসলিম লীগ শাসকরা বার বার প্রলোভন দেখিয়েছে। সামরিক শাসক আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর কিংবা পছন্দের যে কোনো রাষ্ট্রীয় পদে নিযুক্ত হওয়ার টোপ দিয়েছেন। অবলীলায় সব প্রত্যাখান করেছেন। নিজে যেমন ছিলেন দৃঢ়চেতা, স্ত্রীর কাছ থেকেও পেয়েছেন সব ধরনের সহযোগিতা, সমর্থন। ১৯৫০ সালে জেলে থাকার সময়েই স্ত্রীর কাছ থেকে শুনেছেন সেই অভয় বাণী- ‘জেলে থাক আপত্তি নাই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ।’ [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১৯১]।

বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ততদিনে সংকল্পবদ্ধ হয়ে গেছেন। জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করার জন্য বাংলার পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্ত্রীর কাছ থেকে এমন সমর্থন সাহস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় বৈকি। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনকালে গ্রেফতার হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক অফিসার মন্তব্য করেছেন- ‘এ বন্দী ভীত-সন্ত্রস্ত হননি। কর্মীদের তিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে হুইসপারিং ক্যাম্পেইন চালাতে বলেছেন। এটাও বলছেন- সামরিক শাসনের উদ্দেশ্য পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনীতে পরিণত করা। [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯]

এবার বন্দি হওয়ার পর ২৮ নভেম্বর কারাগারে দেখা হয়েছিল বেগম মুজিবের। তখন তিনি স্বামীকে বলেন, সিদ্ধেশ্বরীর যে বাড়িতে রয়েছি- আশপাশে জঙ্গল। পানির কষ্ট। মশা-মাছির উৎপাত। বাড়ি বদলানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু শেখ মুজিবের পরিবারকে ভয়ে কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৯]

বাঙালির স্বার্থের জন্য যে কোনো কষ্ট সহ্য করতে তিনি সদা প্রস্তুত, এমন কথা বার বার বলেছেন। ১৯৫২ সালের ১৪ জুন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এক চিঠিতে লিখেছেন- ‘Please don’t think for me. I have born to suffer.’ [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৯]

১৯৬৬ সালের মে মাসের পর শেখ রাসেল বার বার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি পিতার সঙ্গে দেখা করেছেন। বঙ্গবন্ধু ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে এ সব সাক্ষাতের বর্ণনা দিয়েছেন, যা পাঠ করে আমরা অশ্রুসিক্ত হই। ১৯৬৬ সালের ৬ জুলাই তিনি লিখেছেন, ‘বাচ্চারা দেখতে চায় কোথায় থাকি আমি। বললাম, বড় হও, মানুষ হও দেখতে পারবা।’ [পৃষ্ঠা ১৫০]

কিন্তু শেখ রাসেলের আর ‘বড় হওয়া হয়নি’! তাঁর পিতা বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য যেখানে বন্দি ছিলেন, সে স্থান সম্পর্কে জানা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে ১১তম জন্মবার্ষিকী পালনের আগেই তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে। এ বাড়ির একটি কক্ষেই তার জীবনের শুরু হয়েছিল, এ বাড়ির পাশের একটি বাড়িতেই ১৯৭১ সালে কেটেছে তার বন্দিজীবন, এ বাড়িতেই তাকে ব্রাশফায়ারে মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।

শেখ রাসেলের বেড়ে ওঠা সহজ ছিল না। তার জন্মের দিন পিতা চট্টগ্রামের এক জনসভায়। পরের কয়েকটি মাস হয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাড়ির বাইরে, মাঝে মধ্যে স্বল্পমেয়াদে জেলেও যেতে হয়েছে। দেড় বছর বয়সে পিতা বন্দি হলেন। তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি রাখা হয় একটানা প্রায় তিন বছর। এ সময় সংসার চালানো, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় মেটানো, মামলার খরচ জোগানোসহ নানা প্রয়োজন মেটাতে বেগম মুজিবকে গহনা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। বড় মেয়ে শেখ হাসিনার বিয়ে দিয়েছেন এ সময়েই, যা নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশ হয়েছিল এভাবে- ‘শেখ মুজিবের জ্যেষ্ঠা তনয়ার বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় নিরানন্দ ও আলাকসজ্জাবিহীন পরিবেশে।’

ছাত্রসমাজ ও জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করার জন্য প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে। তিনি মুক্ত হয়ে নন্দিত হন বঙ্গবন্ধু হিসেবে। কিন্তু মুক্ত হওয়ার পরপরই শুরু হয় নতুন পর্যায়ের সংগ্রাম ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের জন্য বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সর্বত্র প্রচার চালাতে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, ছোট্ট রাসেলের সঙ্গে সময় কাটানোর অবসর কোথায় তাঁর? ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকেই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়। আপামর জনগণ এ সংগ্রামে যুক্ত হয়ে যায়। শিশু শেখ রাসেলও বাদ ছিল না। ২৫ মার্চের পর যে কোনো মুহূর্তে তাঁর প্রাণ যেতে পারত। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া লিখেছেন, শেখ জামাল নিঁখোজ হওয়ার পর ধানমন্ডি ১৮ নম্বর সড়কের বাড়িতে আর্মি নিরাপত্তা আরও জোরদার করে। সৈন্য সংখ্যা এক কম্পানি থেকে দুই কম্পানিতে বৃদ্ধি করে। এক পাঞ্জাবী হাবিলদারের অধীনে এক কম্পানি ও অপর এক পাঠান হাবিলদারের অধীনে আর এক কম্পানি সৈন্য উক্ত বাড়ির প্রহরার উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়। বাড়ির ছাদে বালির বস্তা দিয়ে নির্মিত বাঙ্কারে ভারি মেসিনগান ও গাড়ি গ্যারেজের ছাদে মাঝারি ক্ষমতাসম্পন্ন মেসিনগান স্থাপন করা হয়। [বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ৯১]।

এমন কঠিন বন্দিজীবনেই শিশু রাসেল কী জেনেছিল- পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি প্রদানের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে? অগ্রজ দুই ভাই পাকিস্তানি হানাদারদের নাকাল করার জন্য রণাঙ্গনে যে বীরের মতো লড়ছে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কিংবা বিবিসিতে এ খবর জেনে কেউ কি তার কাছে সেটা বলেছিল? ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করে। শেখ রাসেল মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মুক্ত হয় পরদিন, ১৭ ডিসেম্বর। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে যখন ধানমন্ডি ১৮ নম্বর সড়কের আশপাশসহ গোটা বাংলাদেশ মুখরিত, রাসেল মুক্ত হয়ে সবার সঙ্গে কণ্ঠ মেলায়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসেন পরের বছর, ১০ জানুয়ারি। দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রীর। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। শেখ রাসেল ও পরিবারের সদস্যদের ‘নতুন জীবন’ শুরু হয়। তবে এ জীবনও আগের মতোই সাধারণ, ক্ষমতার আয়েশী জীবন কিংবা দম্ভের বিন্দুমাত্র স্থান নেই যেখানে। শেখ রাসেল আর দশটি শিশুর মতো সাধারণ ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায়। তার গৃহশিক্ষক গীতালি দাশগুপ্তা প্রতিদিন পড়াতে আসেন, যার প্রতিটি কথা রাসেল মানে নিজের বিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষকদের মতোই। গৃহশিক্ষক তাকে গৌতম বুদ্ধের জীবনকথা শোনান। রাসেল গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে বাবার জন্য, যিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন এবং অন্যান্য কাজ থেকে ফেরার পর শিশুমনের প্রশ্ন শোনেন- ‘তুমি কি গৌতম বুদ্ধের জীবনকথা জান? আমি আপার কাছে জেনেছি। তিনি সব মানুষের ভাল চাইতেন। তুমিও তাই চাও, তাই না?’ ভাই-বোনসহ অনেকের স্নেহের বেড়ে ওঠা রাসেল মায়ের কঠোর শাসনও দেখেছে। ড. ওয়াজেদ মিয়া লিখেছেন, নতুন গণভবনে পরিবারের উঠে যাওয়ার প্রশ্ন এলে ‘আমার শাশুড়ি কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই বাসভবনে অবস্থান করতে অস্বীকৃতি জানান। এর কারণ হিসেবে তিনি বললেন যে, সরকারি ভবনের আরাম-আয়েশে প্রতিপালিত হলে তাঁর ছেলেমেয়েদের মন-মানসিকতা ও আচার আচরণে অহমিকাবোধ ও উন্নাসিক ধ্যান-ধারণা সৃষ্টি হবে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।’ [বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১৭৪]

বঙ্গমাতা তো এমনই হবেন! শেখ রাসেল এমন সাধারণ, অনাড়ম্বর জীবনে যেন বেড়ে ওঠে সে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন। রাসেল অগ্রজ শেখ কামালের সঙ্গে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের ফুটবল খেলা দেখতে যায়। দল ভাল খেললে মাঠে আনন্দে গড়াগড়ি খায়। পরাজিত হলে কেঁদে ফেলে, খাওয়া বন্ধ করে দেয়। বাড়ির প্রাঙ্গণে ফুল গাছ লাগায়, কবুতরকে খাবার দেয়, সাইকেল চালায়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করে। গণভবনে গিয়ে লেকে বড়শি দিয়ে মাছ ধরে। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে যায় দূরন্ত শৈশবে স্বপ্নের ডানা মেলে আকাশে ওড়ার প্রবল আকাঙ্খা। কিন্তু এগার বছর পূর্ণ হতে না হতেই জীবন থামিয়ে দেওয়া হয় তার। প্রিয় বড় বোন শেখ হাসিনা তার মতো অগণিত শিশুদের বিকাশের জন্য অনন্ত সম্ভাবনা সৃষ্টি করে দিয়েছেন, সেটা তার দেখা হলো না। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর। দারিদ্র্য বিদায় নিচ্ছে। শিক্ষার দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত। যে সোনার বাংলা গড়ে তোলায় পিতা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তেমন বাংলাদেশ আজ গড়ে উঠছে। খাদ্যের অভাব নেই, বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত গোটা দেশ। সাইকেল রাসলের প্রিয় বাহন ছিল, কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশে তো সে মহাকাশে বিচরণের স্বপ্নপূরণ করতে পারত। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে মোটরগাড়ি বা ট্রেনে চেপে সে ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে চলে যেতে পারত প্রিয় গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। শৈশবের খেলার সাথীরা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। তাদের নিয়ে প্রিয় মধুমতি নদীতে সাঁতার কাটা যাবে না। কিন্তু গ্রামের বদলে যাওয়া দৃশ্য তাকে মোহিত করত, সন্দেহ নেই। মাছ-মাংস-সবজি-দুধ দিয়ে ভাত আজ ঘরে ঘরে। কিন্তু হায়! বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময় এ আনন্দ উপভোগ থেকে সে যে বঞ্চিত! এ জন্য যারা দায়ী, বাংলাদেশ তাদের ক্ষমা করবে না।